আবারো অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকাদান কর্যক্রম শুরু হবে ইউরোপে

ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত যেসব দেশে করোনা প্রতিরোধে অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকাদান কর্যক্রম স্থগিত করা হয়েছিল, তাদের বেশিরভাগ দেশেই আবার এ টিকা দেয়া শুরু করা হবে বলে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। ইইউ-এর ওষুধ নিয়ন্ত্রক সংস্থা অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকাকে ‘নিরাপদ এবং কার্যকর’ বলে আখ্যা দেয়ার পর জোটের ওইসব দেশ এ টিকা দেয়া শুরু করবে।শরীরে রক্ত জমাট বাঁধার সাথে এ টিকার সম্পর্ক থাকার শঙ্কা থেকে ইইউ-এর ১৩টি দেশ এ টিকা দেয়া স্থগিত করেছিল। পরে ইউরোপিয়ান মেডিসিন এজেন্সি (ইএমএ) বিষয়টি পর্যালোচনা করওই পর্যালোচনায় বলা হয় যে রক্ত জমাট বাঁধার উচ্চ ঝুঁকির সঙ্গে এ টিকার সম্পর্ক নেই। এখন জার্মানি, ইতালি, ফ্রান্স, ও স্পেন বলছে যে তারা এ টিকা দেয়া আবার শুরু করবে।

তবে কবে থেকে এ টিকা দেয়া শুরু হবে, তা দেশগুলোর নিজস্ব সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। যেমন সুইডেন বলেছে যে সিদ্ধান্ত নিতে তাদের আরো কিছুটা সময় দরকার। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বৃহস্পতিবার দেশগুলোকে টিকা নেয়ার আহ্বান জানিয়েছে। সংস্থাটি এ টিকার বিষয়ে তাদের পর্যবেক্ষণ শুক্রবার প্রকাশ করবে।ইউরোপিয়ান মেডিসিন এজেন্সি নির্দিষ্ট করে অল্প কিছু ঘটনার বিষয়ে তদন্ত করেছে। যেসব ঘটনায় শরীরে অস্বাভাবিক অনিয়ন্ত্রিত রক্তচাপ ছিল। বিশেষ করে তারা ওই সব ঘটনার দিকে নজর দিয়েছে যেখানে মাথায় রক্ত জমাট বেঁধেছে।টিকার ব্যবহার স্থগিত করার সিদ্ধান্ত ওই অঞ্চলে টিকাদান কার্যক্রমে উদ্বেগ তৈরি করে। যার ফলে ইতিমধ্যে এর প্রভাব হিসেবে টিকার যোগানের স্বল্পতা দেখা দিয়েছে।

ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী জঁ ক্যাটেক্স বৃহস্পতিবার তার দেশের জন্য নতুন পদক্ষেপ ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘এটা পরিষ্কার যে মহামারি দ্রুত গতি পাচ্ছে এবং মনে হচ্ছে সংক্রমণের তৃতীয় ঢেউ বাড়ছে।’ পঞ্চান্ন বছর বয়সী ক্যাটেক্স বলছেন যে তিনি শুক্রবার বিকেলে টিকা নেবেন।ইউরোপীয় মেডিসিন এজেন্সি আসলে কী বলছে?

ইউরোপীয় মেডিসিন এজেন্সির নির্বাহী পরিচালক এমার কুক এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘এ টিকা নিরাপদ এবং কার্যকরী।’

কোভিড-১৯-এর সংক্রমণের ফলে মৃত্যু বা হাসপাতালের চিকিৎসা নেয়ার যে সম্ভাব্য ঝুঁকি রয়েছে, তার তুলনায় এ টিকার উপকারী দিক হলো যে টিকাটি এসব ঝুঁকি থেকে রক্ষা করবে।’

এমার কুক বলেন, ইএমএ’র ওষুধ নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিশেষজ্ঞ কমিটি জানিয়েছে যে ‘রক্ত জমাট বাঁধার সামগ্রিক ঝুঁকি বাড়ার সাথে এ টিকার সংশ্লিষ্টতা নেই।’

তবে তিনি এটাও বলেন যে ইএমএ অল্প সংখ্যক বিরল এবং অস্বাভাবিক কিন্তু খুবই গুরুত্বপূর্ণ রক্ত জমাট বাঁধার ঘটনার সঙ্গে এর সম্পর্ককে একেবারে উড়িয়ে দিচ্ছে না।

তাই এ কমিটি প্রস্তাব করেছে টিকার সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করা, টিকাতে তৈরিতে কি ব্যবহার করা হচ্ছে সেটা জানানো নিশ্চিত করা। কুক বলেন, এ ব্যাপারে অতিরিক্ত তদন্ত করা হচ্ছে।

এমার কুক বলেন, ‘যদি এটা আমি হতাম, তাহলে আগামীকাল টিকা নিতাম। কিন্তু আমি জানতে চাই টিকা নেয়ার পর যদি কিছু হয়, তাহলে আমার তখন কী করা উচিত হবে। সেটার কথাই আজ আমরা বলছি।’

অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকাকে নিরাপদ ও কার্যকরী হিসেবে ঘোষণা দেয়ার পর জার্মানির স্বাস্থ্যমন্ত্রী ইয়েন্স স্পাহন বলেন, ‘যেসব নারীর বয়স ৫৫ বছরের নিচে তাদের রক্তনালীতে রক্ত জমাট বাঁধার ঝুঁকির ব্যাপারে ডাক্তারদের কাছে তথ্য থাকা উচিত। যাতে তারা রোগীকেও টিকার ব্যাপারে তথ্য দিতে পারে।’

ইউরোপীয় দেশগুলো কেন এমন করলো?

ওই অঞ্চলে অল্প কিছু মানুষের মধ্যে রক্ত জমাট বাঁধার ঘটনার পর ১৩টি দেশ টিকা দেয়া স্থগিত করে। প্রথম সারির এ রাষ্ট্রগুলো বলেছে যে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে তারা এটি স্থগিত করেছিল।

ফ্রান্সের সরকারের উপদেষ্টা বোর্ডের প্রধান অ্যালান ফিসার ফ্রান্স ইন্টার রেডিওকে বলেন, ‘সময় শেষ হয়ে যায়নি। কিছু অস্বাভাবিক ও সমস্যাযুক্ত ঘটনা ছিল যার কারণে এ স্থগিতাদেশ। এটা সঠিক ছিল।’

জার্মানির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ও ইঙ্গিত দিয়েছে যে টিকা নেয়ার পর কয়েকজনের রক্ত জমাট বাঁধার ঘটনায় তারা এ সিদ্ধান্ত নেয়। অন্যান্য দেশ যেমন অস্ট্রিয়া টিকা দেয়া স্থগিত করে। তবে বেলজিয়াম, পোল্যান্ড ও চেক রিপাবলিক ওই সব দেশের মধ্যে রয়েছে যারা বলেছে যে অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা তারা চালু রাখবে।

অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা স্থগিত করার সিদ্ধান্তকে কিছু রাজনীতিবিদ ও বিজ্ঞানী সমালোচনা করেছেন।

জার্মানির বিরোধীদল ফ্রি ডেমোক্রাটসের একজন মুখপাত্র বলেছেন যে এ সিদ্ধান্ত দেশটির সামগ্রিক টিকা কর্মসূচিকে পিছিয়ে দিয়েছে। জার্মান গ্রিন পার্টির স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ইয়ানোস ডাহমেন মনে করেন, কর্তৃপক্ষ টিকা কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারত।

যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব বার্মিংহ্যামের ওষুধ নিরাপত্তা গবেষক ডা. অ্যান্থনি কক্স এটিকে একটি খারাপ সিদ্ধান্ত হিসেবে বর্ণনা করে বিবিসিকে বলছেন যে এ সিদ্ধান্ত ইউরোপজুড়ে ছড়িয়ে গেছে।

অ্যাস্ট্রাজেনেকা কী বলছে?
কোম্পানিটি বলছে যে টিকা নেয়ার ফলে রক্ত জমাট বাঁধার কোনো প্রমাণ নেই। তারা বলছে, মার্চের ৮ তারিখ পর্যন্ত ইইউ এবং যুক্তরাজ্যে এক কোটি ৭০ লক্ষের বেশি মানুষ এ টিকা নিয়েছে। যাদের মধ্যে ৩৭ জনের শরীরে রক্ত জমাট বাঁধার ঘটনা ঘটেছে বলে বলা হয়েছে। যে বিশাল সংখ্যক জনগণকে এ টিকা দেয়া হয়েছে, ওই তুলনায় এ সংখ্যাটা অনেক কম।

অধ্যাপক অ্যান্ড্রু পোলার্ড অক্সফোর্ড ভ্যাকসিন গ্রুপের পরিচালক যারা অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা তৈরি করেছে। তিনি বিবিসিকে সোমবার বলেন, ‘যুক্তরাজ্যে রক্ত জমাট বাঁধা বাড়ছে এমন কোনো প্রমাণ নেই।’

ব্রিটিশ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ম্যাট হ্যানকক নিয়ন্ত্রক সংস্থার কথা শোনার জন্য এবং টিকার নিতে সবার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।